কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য এক অপার নিয়ামত। এটি কেবল একটি পাঠ্যগ্রন্থ নয়; বরং হিদায়াত, রহমত ও নাজাতের পথনির্দেশক। কুরআনের সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক যত গভীর হয়, তার ইমান ও আমল ততই সমৃদ্ধ হয়। কুরআনের তেলাওয়াত শুধু নেকি অর্জনের মাধ্যমই নয়, বরং তা বান্দাকে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ও প্রিয় করে তোলে এবং তার আমলসমূহকে উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান করে দেয়।

অর্থ না বুঝে কুরআন তেলাওয়াত: শাস্তি না সওয়াব?

অনেক মুসলমান অর্থ না বুঝেই মূলত সওয়াব অর্জন ও খতম দেওয়ার নিয়তে কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করেন,  এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কুরআনের অর্থ না বোঝার কারণে বা না বুঝে আমল না করার কারণে কী পরকালে কোনো শাস্তি হবে?

এর সুস্পষ্ট উত্তর হলো— ‘না’, কুরআনের অর্থ না বোঝার কারণে কোনো শাস্তি নেই।

কারণ কুরআনের আরবি তেলাওয়াত নিজেই একটি স্বতন্ত্র ও মহান ইবাদত। অনুবাদসহ কুরআন পড়া ফরজ বা আবশ্যক নয়। অর্থ না বুঝে তেলাওয়াত করলেও তা অত্যন্ত মূল্যবান ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় এবং এর জন্য বিশেষ সওয়াব প্রদান করা হয়।

কুরআনের প্রতিটি অক্ষরে নেকি

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ المٓ حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ، وَلَامٌ حَرْفٌ، وَمِيمٌ حَرْفٌ

‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে; আর একটি নেকি দশ গুণে বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলছি না যে ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর; বরং ‘আলিফ’ একটি অক্ষর, ‘লাম’ একটি অক্ষর এবং ‘মীম’ একটি অক্ষর।’ (তিরমিজি ২৯১০)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—‘আলিফ-লাম-মীম’-এর অর্থ মানুষের কাছে অজানা হলেও এর তেলাওয়াতে পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়। এতে প্রমাণিত হয়, কুরআনের আরবি তেলাওয়াত নিজেই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ইবাদত, অর্থ বোঝা না বোঝা সত্ত্বেও।

অনুবাদ পড়া ও আরবি তেলাওয়াত— দুটির মর্যাদা

যে ব্যক্তি আরবি তেলাওয়াত না করে কেবল অনুবাদ পড়ে বা অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, সে অবশ্যই কুরআনের মর্মার্থ বোঝার সওয়াব পাবে। তবে সে আরবি তেলাওয়াতের জন্য নির্ধারিত প্রতিটি অক্ষরের দশ নেকির সওয়াব লাভ করবে না।

অন্যদিকে যে ব্যক্তি আরবি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে দশ নেকির অধিকারী হয়। অতএব বলা যায়—

আরবি তেলাওয়াত → সওয়াবের মূল উৎস

অর্থ বোঝা, অনুবাদ পড়া ও চিন্তা করা → সওয়াব বৃদ্ধির মাধ্যম

দুটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং পরস্পর পরিপূরক।

তবে কি কুরআন না বোঝা গাফিলতি?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন। কুরআনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তেলাওয়াত নয়; বরং বুঝে আমল করা। তাই যে ব্যক্তির শেখার সুযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় সময় ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি সে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের অর্থ বোঝার চেষ্টা না করে, তবে তা গাফিলতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে সাধারণ পাঠক— যিনি নিয়মিত তেলাওয়াত করেন, আন্তরিক নিয়তে সওয়াবের আশায় কুরআন পাঠ করেন— তিনি শাস্তির নয়, বরং সওয়াবের অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিয়ত ও চেষ্টা অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেবেন।

তাহলে করণীয় কী?

কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কের সর্বোত্তম রূপ হলো—

> নিয়মিত আরবি তেলাওয়াত করা

> ধীরে ধীরে বিশ্বস্ত আলেম বা সহিহ তাফসিরের মাধ্যমে অর্থ শেখার চেষ্টা করা

> যা বোঝা যায়, তা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা

> এভাবেই কুরআন হবে কেবল পাঠের নয়, বরং জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ দিশারি।

সুতরাং, কুরআন মাজিদের অর্থ না বোঝার কারণে পরকালে কোনো শাস্তি নেই। অর্থ না বুঝে তেলাওয়াত করলেও তা মহান ইবাদত এবং বিপুল সওয়াবের মাধ্যম। তবে যার সুযোগ রয়েছে, তার জন্য উত্তম হলো— তেলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআন বোঝার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া। এতে সওয়াব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কুরআন বাস্তব জীবনে হিদায়াতের আলো হয়ে উঠবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *