সর্বশেষঃ

ফারিন জাহান সিগমা

দেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে অন্তত ২০০টি শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। এ তথ্য কিডস হার্ট ফাউন্ডেশনের।

দেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে অন্তত ২০০টি শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। অর্থাৎ বছরে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। এ তথ্য কিডস হার্ট ফাউন্ডেশনের। বর্তমানে দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। কিন্তু এতসংখ্যক হৃদরোগী শিশুর চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৫৩ এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আছেন ১৫ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় কার্ডিওলজিস্ট এবং দক্ষ সার্জনের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোয় এ ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও অপ্রতুল। এসব কারণে চিকিৎসা নিতে আসা শিশু এবং তাদের অভিভাবককে পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। আর্থিকভাবে সচ্ছল অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের দেশের বাইরে চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়। এমন অনেক শিশু চিকিৎসক ও অবকাঠামো সংকটের কারণে সময়মতো চিকিৎসা পায় না।

পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জনের অপ্রতুলতাই এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল কবীর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে শিশুরা জন্মগতভাবে হৃদরোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিছু জিনগত কারণও রয়েছে। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা কম। এর মধ্যে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আরো কম। দেশে এ রকম সার্জন আছেন মাত্র ১৫ জন। এত অল্পসংখ্যক সার্জন দিয়ে বিরাটসংখ্যক রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব নয়।’

শিশু আরিফ হোসেনের (ছদ্মনাম) বয়স তিন বছর। জন্ম থেকেই তার হৃদযন্ত্রে ছিদ্র ছিল। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় গত বছর রংপুর থেকে আরিফের বাবা-মা তাকে চিকিৎসা করাতে ঢাকায় নিয়ে আসেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আরিফের হৃদযন্ত্রে ফুটো ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন অস্ত্রোপচারের। চলতি বছরের অক্টোবরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির সিরিয়াল পেতে তাদের অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এ প্রতিবেদক যখন সপ্তাহখানেক আগে আরিফের খোঁজ নিয়েছিলেন তখন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন সপ্তাহ অতিক্রম হলেও আরিফের অস্ত্রোপচারের তারিখ পাওয়া যায়নি।

আরিফের মা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথম দিকে বুঝতে পারি নাই আমার ছেলের হৃদযন্ত্রে ছিদ্র। কয়দিন পর পর অসুস্থ হতো। রোগটা গত বছর ধরা পড়ে। প্রথমে তো হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি। বাড়ির অনেকে বলল ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু আমাদের তো এত টাকা-পয়সা নেই। তাই শেষমেশ এখানে আসি। দুই-তিন সপ্তাহ আগে ভর্তি করাতে পেরেছি। এখনো সার্জারির সিরিয়াল পাওয়া যায়নি। আনুমানিক কোনো তারিখও তারা জানায়নি। এখানে থাকা-খাওয়ারও একটা খরচ আছে। সামান্য জমানো টাকা নিয়ে ঢাকায় আসছি। সামনে কী হবে তা জানি না। এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

আরিফের মতো অনেক শিশুরই চিকিৎসা পেতে লম্বা সময় লাগছে। অনেক শিশু হাসপাতালে ভর্তির পর সার্জারির তারিখ পেতে মাস পেরিয়ে যায়।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এনআইসিভিডির পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের একজন চিকিৎসক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরো দেশেই এ বিশেষায়িত চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকারিভাবে আমাদের এখানেই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। লোকবল কম, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অপ্রতুল। শিশুদের জন্য আলাদা কোনো ক্যাথল্যাব নেই। আমাদের জন্য আলাদা ওটি (অস্ত্রোপচার কক্ষ) ও আইসিইউ নেই। এসব কারণে এখানে সার্জারির তারিখ পেতে সামান্য সময় লাগে। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।’

বিশ্বের অন্য অনেক দেশে হাজারে ৮-১০ জন শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্ম নিলেও বাংলাদেশে সেই সংখ্যা অনেক বেশি। এনআইসিভিডি থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে চার থেকে পাঁচ লাখ শিশু হৃদরোগে ভুগছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। যেমন হার্টের ছিদ্রজনিত রোগ। আর ১০ শতাংশ জন্মের পর বিভিন্ন কারণে হার্টের সমস্যায় ভুগে থাকে। যেমন–জ্বরের কারণে হার্টের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, হার্টে সংক্রমণ, হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া। প্রতি বছর দেশে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিশু হৃদরোগী শনাক্ত হচ্ছে।

আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে যে সংখ্যক হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু রয়েছে তার বিপরীতে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের প্রয়োজন অন্তত ২০০ জন এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জনের সংখ্যা ১০০ জন হওয়া জরুরি। কিন্তু দেশে আছেন এর এক-চতুর্থাংশেরও কম। দেশের মোট ১৫টি হাসপাতালে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে নয়টি ঢাকায়। পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের ৩০ জন এবং ১০ জন পেডিয়াট্রিক সার্জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে শিশুর হৃদরোগের চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে।

পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সোসাইটি অব বাংলাদেশের (পিসিএসবি) সাধারণ সম্পাদক এবং এনআইসিভিডির পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুদের হৃদরোগের সমস্যা বেশ পুরনো। কিন্তু অধ্যয়নের বিষয়টি নতুন। এ কারণে বিষয়টিতে শিক্ষার্থীরা পড়তে আগ্রহী হয় না। তাছাড়া সরকারিভাবে পদ সৃষ্টি করা হয়নি। আবার যতগুলো পদ রয়েছে সেগুলোয়ও লোক নেই। ঢাকায় তা-ও কিছু চিকিৎসক রয়েছেন। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো নাজুক। আমাদের হাসপাতালেই নানা সংকট রয়েছে। শিশুর যে শুধু হৃদরোগের সমস্যা থাকবে, তা কিন্তু না। হৃদরোগের পাশাপাশি তার আরো অনেক সমস্যা থাকতে পারে। নার্ভের সমস্যা কিংবা পেটের সমস্যাও থাকতে পারে। কিন্তু সব চিকিৎসার ব্যবস্থা আমাদের হাসপাতালে নেই। তাই প্রায়ই আমাদের রোগীদের বাইরে পাঠানো লাগে সম্পর্কিত অন্যান্য চিকিৎসার জন্য। সেক্ষেত্রে রোগীর যেমন খরচ বেড়ে যায়, আবার আমাদের চিকিৎসা শুরু করতেও বিলম্ব হয়।’

পরিস্থিতির উন্নয়নে পরামর্শ দিয়ে এ চিকিৎসক আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে যেন শিক্ষার্থীরা পড়তে আগ্রহী হয় এবং রোগীর সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা যায় সেজন্য সরকারের কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বাইরের দেশে বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া শিশু হৃদরোগের চিকিৎসায় ভর্তুকির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিশুদের কার্ডিয়াক সার্জারি কিছুটা ব্যয়বহুল। অনেক পিতা-মাতাই এ খরচ চালাতে পারেন না। তাই আমি মনে করি সেবার পাশাপাশি এ খাতে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেয়াও প্রয়োজন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *